আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশ্বব্যাপী প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন

পলাতক প্রতারক দম্পতি মহিউদ্দীন আহমেদ (৪৮) এবং তাঁর স্ত্রী সৈয়দা শিনিয়াত নুরী (৪০) এর বিরুদ্ধে মামলা**

*লভ্যাংশের কথা বলে টাকা আত্মসাৎ, পাওনাদারকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ব্যবসার নামে প্রলোভন দেখিয়ে লন্ডন প্রবাসীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক দম্পতির বিরুদ্ধে। চুক্তির মেয়াদ শেষে পাওনা ৫৬ লাখ টাকার বেশি অর্থ ফেরত চাইতে গেলে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও হত্যার হুমকির অভিযোগে ওই দম্পতির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গত ২০ আগস্ট হাতিরঝিল থানায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি (মামলা নং- ২৩) দায়ের করেন ভুক্তভোগী প্রবাসী মো. তহিদুল ইসলামের আইনি প্রতিনিধি (আমমোক্তার) ইমাম হাসান সাইফী।

মামলার আসামিরা হলেন—রাজধানীর ধানমন্ডির জিগাতলা (সাউথ প্রাইড) এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন আহম্মেদ (৪৮) এবং তাঁর স্ত্রী সৈয়দা শিনিয়াত নুরী (৪০)।

এজাহারে যা বলা হয়েছে

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী মো. তহিদুল ইসলাম এবং প্রধান আসামি মহিউদ্দিন আহম্মেদ একে অপরের পরিচিত। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে ব্যবসায়িক প্রলোভন দেখিয়ে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর তাঁদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, তহিদুল ইসলাম দুই বছরের জন্য ৭০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। কথা ছিল, এই সময়ে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা লভ্যাংশ আসবে। চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশের ৬০ শতাংশ পাওয়ার কথা তহিদুলের এবং ৪০ শতাংশ পাওয়ার কথা মহিউদ্দিনের। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই মগবাজারের রাজ্জাক প্লাজায় মহিউদ্দিনের হাতে নগদ ৭০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়।

তহিদুল ইসলাম বিদেশে যাওয়ার আগে ৮০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দলিলের মাধ্যমে তাঁর প্রতিনিধি ইমাম হাসান সাইফীকে পাওনা বুঝে নেওয়ার আইনি দায়িত্ব দিয়ে যান। এরপর আসামি মহিউদ্দিন সিটি ব্যাংকের মগবাজার শাখার মাধ্যমে তিন দফায় (২০২৫ সালের ২২ জুলাই থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত) মোট ৪৩ লাখ ৪২ হাজার ১০৯ টাকা পরিশোধ করেন।

কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও আসল টাকার অবশিষ্ট ২৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫১ টাকা এবং লভ্যাংশের ৩০ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫১ টাকা দিতে আসামিরা টালবাহানা শুরু করেন।

টাকা চাইলে প্রাণনাশের হুমকি
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পাওনা টাকা আদায়ে বারবার যোগাযোগ করা হলেও আসামিরা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাতিরঝিলের মগবাজারস্থ রাজ্জাক প্লাজায় আসামিদের সঙ্গে পাওনাদারের সাক্ষাৎ হয়। সেখানে বকেয়া ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৫১ টাকা চাইলে আসামিরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।

একপর্যায়ে মহিউদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ‘আর টাকা দিব না।’ এ সময় পাওনাদারকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেন তাঁরা। ভবিষ্যতে এ নিয়ে মামলা করলে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা হবে বলেও শাসিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ওই দম্পতি। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব ধারায় মামলা ও সম্ভাব্য শাস্তি

হাতিরঝিল থানা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটি আমলে নিয়ে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪২০, ৫০৬(২) এবং ৩৪ ধারায় রুজু করেছে। আইনজ্ঞদের মতে, অপরাধগুলো জামিন অযোগ্য এবং প্রমাণিত হলে আসামিদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে:

৪২০ ধারা (প্রতারণা ও জালিয়াতি): ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে এই ধারায় আসামিদের সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
৪০৬ ধারা (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ): চুক্তি ভঙ্গ করে আমানতের টাকা আত্মসাৎ করায় এই ধারায় সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
৫০৬-২ ধারা (প্রাণনাশের হুমকি): পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
৩৪ ধারা (পরস্পর যোগসাজশ): যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ সংঘটিত করেছেন, তাই এই ধারায় দুজনেই সমান অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।

মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুজ্জামানকে। মামলার এজাহারের সঙ্গে প্রমাণস্বরূপ তিন পাতার চুক্তিপত্রের ফটোকপি, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী এবং আট পাতার আমমোক্তারনামা দলিল সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণার মামলা। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে আসামিদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

সম্পর্কিত সংবাদ